মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতিসত্ত্বার সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়। ১৯৭১ সালে ০৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বাঙালি জাতি পাকিস্তানী শাসন ও শোষক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা শুরু করে। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে শুরু হয় পাক- হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিষ্ঠুর গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের সূচনালগ্নে পাক-বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। শুরু হয় অবরুদ্ধ স্বদেশ থেকে দখলদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার মরণপণ লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ।

সীমান্ত পরিবেষ্টিত ও ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চগড়ে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে সংঘটিত হয়েছে ব্যাপক যুদ্ধ। বাংলাদেশে ০৪টি মুক্তাঞ্চলের মধ্যে পঞ্চগড় মুক্তাঞ্চল যুদ্ধের গতি প্রকৃতি নির্ণয়ে ও পরিকল্পনা প্রণয়নে অবিস্মরণীয়ভূমিকা রাখে ।

পঞ্চগড়ের ইতিহাসে ১৯৭১ সালে ১৭ই এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিন পাক- বাহিনী দখল করে নেয় পঞ্চগড়। জ্বালিয়ে দেয় সাজানো গুছানো পঞ্চগড় শহর এবং হত্যাযজ্ঞ চালায় নির্বিচারে। এছাড়াও পাক হানাদার বাহিনী এদেশীয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সহায়তায় হাজারো নিরস্র জনগণকে হত্যা করে ,তাদের ধনসম্পদ লুটপাট করে ,ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

৬নং সেক্টরের অর্ন্তগত ৬ এ সাব সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বে- সামরিক উপদেষ্টা হিসাবে দাযিত্ব পালন করে তদানিন্তন প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ সদস্য এ্যাডঃ সিরাজুল ইসলাম। বে সামরিক উপদেষ্টা এ্যাডঃ সিরাজুল ইসলাম, এ্যাডঃ কমরউদ্দিন আহমেদ (এম এল এ), এ্যাডঃ মোশারফ হোসেন চৌধুরী (এম এল এ), কাজী হাবিবর রহমান, তেঁতুলিয়া, আব্দুল জববার প্রমুখের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সংঘঠিত হয়ে ও ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে পাক বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দূসর, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা ও সন্মুখ লড়াই শুরু করে। এই এলাকায় ৭টি কোম্পানীর অধীনে ৪০টি মুক্তিযুদ্ধ ইউনিট পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডারের মধ্যে মাহবুব আলমের নাম উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য কমান্ডাররা হলেন, মোঃ মতিয়ার রহমান, মোঃ তরিকুল ইসলাম. মোঃ মোকলেছার রহমান, মোঃ দুলাল হোসেন, আব্দুর রহমান এবং আব্দুল গণি। এ ছাড়া বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বি এল এফ) এর আঞ্চলিক কমান্ডার ছিলেন বিশিষ্ট ছাত্র নেতা নাজিম উদ্দীন আহমেদ। ২৮ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা চার দিক থেকে পাক বাহিনীর উপর ঝড়ো আক্রমন শুরু করে এবং ২৯ শে নভেম্বর পঞ্চগড় পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পনের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে রচিত হলো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।