১. মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা-১

freedom fighter

মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চগড়

মির্জা আবুল কালাম দুলাল (মুক্তিযোদ্ধা)

এ জেলা ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রম্নয়ারী তারিখে গঠিত হয়। ভারত বিভক্তির কয়েকদিন পর ১৯৪৭ সালের ১৮ই আগষ্ট, স্যার সাইরল রেডক্লিক ভারতের জলপাইগুড়ি জেলা ৪টি থানা তেতুলিয়া, পঞ্চগড়, বোদা ও দেবীগঞ্জকে বিচ্ছিন্ন করে তদানিমত্মর পূর্ব পাকিসত্মানের দিনাজপুর জেলার সাথে সংযুক্ত করেন। ৪টি থানা ও আটোয়ারী থানাকে যুক্ত করে মোট ৫টি থানা নিয়ে প্রথমে মহকুমা ও পরবর্তীকালে গঠিত হয় জেলা।

পঞ্চগড় জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর পূর্বাঞ্চল কোচবিহার রাজাদের অধীনে এবং পশ্চিমাঞ্চল ছিল গৌড় (বাংলা) ও দিল্লীর মুসলমান সুলতান, বাদশাহ ও সুবাদারগন কর্তৃক শাসিত। সীমান্ত রক্ষার প্রয়োজনে পঞ্চগড় অঞ্চলে বেশ কিছু গড় নির্মিত হয়। এইরুপ ৫টি গড় বা দূর্গ নগরীর ভিত্তিতে এই জনপদের নামকরণ করা হয় পঞ্চগড়। গড় সমূহ যথাক্রমে মীরগড়, হোসেন গড়, রাজন গড়, ভিতরগড় ও দেবেন গড়।

প্রতিরোধের ধারা বাহিকতা: প্রাক ঐতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক ইংরেজি শাসনাবসান এবং পাকিসত্মান সৃষ্টি পর্যন্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এ অঞ্চলের মানুষ সংগ্রামী, বিদ্রোহী এবং অধিকার আদায়ে অপ্রতিরোধ্য ছিল। তার প্রমান মেলে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহী থেকে ( ১৭৬৩-১৮০০), কৃষকের তেভাগা আগষ্ট তেঁতুলিয়া পঞ্চগড়, বোদা ও দেবীগঞ্জ থানাকে আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিসত্মানের সাথে সংযুক্ত করণ প্রক্রিয়ায়। স্বাধীনতা পূর্ব থেকেই পঞ্চগড় রাজনৈতিক জেলা হিসাবে স্বীকৃত। মূলত: দ্বীজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিসত্মান দেশটি সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট। সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের নিয়েই পূর্ব পাকিসত্মান প্রদেশ, জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিসত্মান তথা বাঙ্গালীদের পশ্চিম পাকিসত্মানীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ও ভাষাগত দ্বন্দ এবং বৈষম্যের ব্যবধান বাড়তে থাকে। পাকিসত্মানের রাষ্টীয় ভাষা উর্দু হওয়ার প্রতিবাদের মধে দিয়ে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনায় শুরু হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। বাঙ্গালী স্বত্তা ও চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটে ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে, এ দেশের মানুষের সাথে পশ্চিম পাকিসত্মানের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়তে থাকে। যার পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয় ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন ১৯৬৬ সালের আওয়ামী লীগের নেতেৃত্বে ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে গঠিত আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গন অভ্যুন্থান। পঞ্চগড়ে রাজনৈতিক দলসমূহের পক্ষের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র সংগঠন ও আপামর জনসাধারণ কারভোগ, জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে প্রতিটি আন্দোলনে গুরম্নত্বপূর্ণ এবং সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে র্নিবাচিত হয়।

স্বাধীরকার আন্দোলন (মার্চ-এপ্রিল) প্রতিরোধ পর্ব: বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়েও পাকিসত্মানী সামরিক শাসক গোষ্ঠীর কাছ থেকে শাসনভার নিতে পারেনি। পাকিসত্মানী কু-শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। গোলটেবিল বৈঠকের নামে ষড়যন্ত্র ও কালক্ষেপন করে রাতের আঁধারে পূর্ব পাকিসত্মানের মাটিতে পাকিসত্মানী অবাঙ্গালী সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে থাকে।

সারাদেশে গোটা বাঙ্গালী জাতি তখন অগ্নিগর্ভ এবং আপামর জনগণ চায় বঙ্গবন্ধুর কাছে স্বাধীনতার ঘোষনা। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক দফা আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। শেস্নাগান ছিল-সারা বাংলা ঘেরাও কর বাংলাদেশ স্বাধীন কর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষমানুষের সমাবেশ মূলত: স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েই দেন। তিনি বলেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার স্যগ্রাম, তোমাদের হাতে যা কিছ আছে তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবেলা করতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, এই ঘোষনার পর গোটা দেশে পাকিসত্মানী শাসন অচল হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের পর পঞ্চগড় রাজনৈতিক জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত মিছিল, সংগ্রামে রাসত্মাঘাট মুখরিত ছিল। একটি শেস্নাগান বাংলাদেশ স্বাধীন কর। সমগ্র পূর্ব পাকিসত্মানে অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনই জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ত্ততি শুরু করে। যুবকদের একটি অংশকে নিয়ে জনাব মো: আববাস আলীর নেতৃত্বে গঠিত হয় জয়বাংলা বাহিনী এবং জনাব মো: গোলাম মোসত্মাফা প্রধান এর নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। ২৩ শে মার্চ ১৯৭১ সারে পঞ্চগড় শের-ই-বাংলা পার্কে উড্ডয়মান পাকিসত্মানী পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন জনাব নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ। তৎকালিন পঞ্চগড় রাজনৈতিক জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ ও এস এম, লিয়াকত আলী পতাকা উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ গোলাম মোসত্মফা, আনোয়ারম্নল ওয়ারেস, এস, এম নুরম্নল হক (ঢাকাইয়া নুরম্ন), মিরগড়ের আজিজার রহমান, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মী বাহিনী ও সংগ্রামী জনতা।

পঞ্চগড় জেলা মূলত: ৫টি থানার সমন্বয়ে রাজনৈতিক জেলা হিসাবে গন্য করা হতো। ৭০ এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ থেকে যারা নির্বাচিত হন তাঁরা হলেন এম মোশারফ হোসেন চৌধুরী (এম,এন, এ)কমরউদ্দিন আহম্মেদ (এম,পি,এ), এবং তরুন নেতা সিরাজুল ইসলাম (এম,পি,এ)।

স্বাধীনতার ঘোষণা: বাঙ্গালী জাতি মূলত ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণেরা পর স্বাধীনতা যুদ্ধের মানসিক প্রস্ত্ততি নিয়েই ফেলে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৫শে মার্চের রাতে গ্রেফতার হওয়ার পুর্বেই বিশেষ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দেনএবং ভিভিন্ন সেনানিবাসে বাঙ্গালী সেনাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ শু্রুর নির্দেশ প্রদান করেন। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মী ছাত্র নেতাদের নির্দেশনা দেন। বঙ্গবন্ধুর আহববানে সারাদিয়ে চট্রগ্রামের কালুর ঘাট স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র (অস্থায়ী) থেকে আওয়ামী লীগের মো: হান্নান বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত স্বাধীনতা ঘোষনা পত্র পাঠ করেন এবং ২৭শে মার্চ তৎকালীন বাঙ্গালী অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান অনুরূপ পত্র পাঠ করেন। সমগ্র বাংলায় (পূর্ব পাকিসত্মানে) শু্রু হয়ে যায় প্রতিরোধ এবং মুক্তিযুদ্ধ। বাঙ্গালী ই,পি,আর পুলিশ এবং সেনাবাহিনী বিদ্রোহী পতিরোধ গড়ে তোলে, আবার কেউবা নিরাপদ অবস্থানে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

২৭ মার্চের পরে পঞ্চগড় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ এবং তরুণ (এম,পি,এ) জনাব সিরাজুল ইসলাম সহ ময়দানদীঘিতে গোপন বৈঠকের সিদ্ধামত্ম মতে এ অঞ্চলে অবস্থিত সীমান্ত, ই,পি,আর ক্যাম্প সমূহে (বি.ও.টি) যোগাযোগ করে বাঙ্গালী ই,পি আরদের পঞ্চগড় ই,পিআর হেড কোয়ার্টারে সংগঠিত করা হয় এবং অবাঙ্গালী সেনাদের অস্ত্রবিহীন (ডিসআর্মড) করে মেরে ফেলা হয়। সুশৃংখলভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আওয়ামী লীগের  নেতা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা কর্মীদের নিয়ে সর্বদলীয় ভাবে গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি অনুরুপ ভাবে পঞ্চগড় রাজনৈতিক জেলার প্রতিটি থানায় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। সমগ্র বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তান) যুদ্ধ যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনও পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুর এলাকা মুক্ত ছিল, অবাঙ্গালী সেনারা সেনা ছাউনিতে বিদ্যমান। বাঙ্গালী সেনারা যে যেভাবে পারে সেনাছাউনি থেকে সরে আসে, পঞ্চগড়ে সংঘঠিত ই,টি,আর পুলিশ, মুজাহিদ আনসারগণ একত্রিত হয়ে এবং ঠাকুরগাঁও উইং এর বাঙ্গালী ই,পি,আর গণের সমন্বয়ে ঠাকুরগাঁও উইং এর বাঙ্গালী ই,পি,আর গণের সমন্বয়ে ঠাকুরগাঁও উইং ২দিন ধরে যুদ্ধ করে পাকসেনাদের হত্যা করে দখল করে নেয়। তারপর পাকিসত্মানী সেনাবাহিনী যাতে উত্তরে অগ্রহর হতে না পারে সে লক্ষে সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী বাঙ্গালী সেনা ই,পি,আর পুলিশ, মুজাহিদ, আনসার। সৈয়দপুর ক্যান্টমেন্ট এর অদুরে ভূষিত বন্দর ব্রীজ নদীর এ পারে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিসত্মানী সেনাবাহিনী মূল সড়ক দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। মুক্তিবাহিনী খান সেনাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে পরাভূত হয়ে পিছিয়ে আসে। মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ দশমাইল হয়ে দিনাজপুরের দিকে চলে যায় এবং অপর অংশটি বীরগঞ্জের ভাতগা ব্রীজের এপারে উত্তর  দিকে আরও একটি প্রতিরোধ গড়ে তুলে, এবং এখানে সম্মুখ যুদ্ধে অনেক মুক্তিবাহিনীর সদস্য শাহাদাত বরণ করেন। পাকিসত্মানীর সেনারা ট্যাংক ও আর্টিলারির সাহায্যে এগুতে থাকে। মুক্তিবাহিনী কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছিয়ে আসে এবং পঞ্চগড় করতোয়া নদী বরাবর এপারে উত্তর দিকে আরও একটি ফ্রন্ট লাইন গড়ে তোলে।

এপ্রিলের শুরুতেই পঞ্চগড়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সস্য এবং তরুণ ও যুবকদের নিয়ে পঞ্চগড় থানা এবং ঈদগাহ মাঠে অস্ত্রের টেনিং চলতে থাকে। প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন আনসার কমান্ডার হেলালউদ্দীন আহম্মদ, খয়রম্নদ্দীন (খই কমান্ডার), বাঘা , নুরম্ন  নোয়াখালী) ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের নায়েক আব্দুল রশীদ ও আরও অনেকে। এপ্রিল মাসের ১২ ও ১৩ তারিখে পঞ্চগড়ে ট্রোনিং প্রাপ্ত তরুণদের বিডি হলে রক্ষাতে এ থানার আনসার ও মুজাহিদদের প্রশিক্ষণের জর্ন্য এলাটেডকৃত অস্ত্র সমূহ আনসার কমান্ডার হেলাল উদ্দিন আহম্মেদ সরবরাহ করেন। বর্তমানের ডায়াবেকি সমিতি ভবন যার আহববায়ক ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ডাঃ এম জহির উদ্দিন আহম্মেদ, সেই ভবনটি মুক্তিবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ছিল। পশ্চাৎপদ মুক্তিবাহিনীকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তথা তরুণদের নিয়ে নবগঠিত মুক্তিবাহিনী খাদ্য সহ অন্যান্য রসদ সামগ্রী সরবরাহ এবং সর্বপ্রকার সহযোগীতা প্রদান করেন। ১৭ই এপ্রিল পাকসেনারা সুসজ্জিত আর্টিলারীর সাহায্যে প্রচুর সংখ্যক পদাতিক সৈন্যের আক্রমনে মুক্তিবাহিনীকে পর্যুদস্থ করে পঞ্চগড় শহর (সদর থানা শহর) দখল করে। এখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়। খান সেনাদের আঘাতে সেদিন ডোকরোড়ার মছিরউদ্দীন, নৈমুদ্দিন, শনিমুলস্নাহ পুরাতন ক্যাম্পের বাবুল, রামের ডাঙ্গার সিদ্দিক হোসেন শাহাদত বরণ করেন এবং গণ-শহীদ হন। পাকসেনারা পঞ্চগড় বাজার সহ অনেক বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দিয়ে প্রথম অবস্থাতেই ত্রাসের সৃষ্টি করে। স্বল্প সংখ্যক মুক্তিবাহিনী সেদিন হালকা অস্ত্রনিয়ে সুসজ্জিত পাক সেনাদের সাথে পেরে উঠেনি, আবারও পশ্চাৎপত হন এবং পঞ্চগড়, তেঁতুলিয়া থানার সীমানা বরাবর চাওয়াই নদীর ওপাড়ে (সর্বোত্তরে) মুক্তিবাহিনী আরও একটি শক্ত ফ্রন্টলাইন গড়ে তোলে। পাক সেনারা আর অগ্রসর হতে পারেনি। পঞ্চগড় দখলের পূর্বেই বোদা থানার পতান হয়। সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ পঞ্চগড় ব্যাংকের টাকা সহ তেঁতুলিয়া থানায় অবস্থান নেয়। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আটোয়ারী থানায় অবস্থিত ফকিরগঞ্জ হাটে পাকিসত্মানীরা আকস্মিক আক্রমন করে ব্রাশ ফায়ার করে নিরিহ ১১ জন মানুষকে হত্যা করে। আটোয়ারী থানা শহর অংশটুকু নিমিষে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ফলে অঞ্চলটির মানুষ প্রানের ভয়ে যে যেভাবে পারে সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে যায় এবং আশ্রয় গ্রহন করে।

১৭ই এপ্রিল মেহেরপুর জেলার (সাবেক কুষ্টিয়া) বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননের মুজিবনগরে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত এম,এন,এ-এম,পি এ ও অন্যান্য প্রশাসনিক বাঙ্গালী ব্যক্তিদের নিয়ে অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের গঠনের পর তেঁতুলিয়া থানা মুক্তাঞ্চলের একটি অস্থায়ী সরকারের প্রশাসন গড়ে ওঠে, অর্থাৎ ভৌগলিক অবস্থানের দিক দিয়ে তেঁতুলিয়া অত্যমত্ম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল। ভারতে এবং অন্যান্য এলাকার সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ছিল বিধায় সামরিক ও বেমাসরিকভাবে একটি দৃঢ় প্রসাশনিক কাঠামোর মাধ্যমে কার্যক্রম চলে।

মিত্র বাহিনীর (ভারত) সাথে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে গেরিলাযুদ্ধ ও সম্মুখ যুদ্ধ তরান্বিত করার লক্ষে ভারতের বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বাংলাদেশর তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়। সে সময়ের তরুণ নেতা এম,পি,এ সিরাজুল ইসলাম সিভিল প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে মুক্তিবাহিনীর সদস্য বৃদ্ধির জন্য মিত্রবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। তরুণদের যুদ্ধে অংশ গ্রহনের লক্ষে্য রিত্রম্নটিং সহ অন্যান্য কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাওয়া বাধারণ মানুষদের নিয়ে সীমান্ত সংলগ্ন স্থানে শরনার্থী শিবির (আশ্রয় স্থল) গড়ে ওঠে। তাদের সার্বিক দ্বায়িত্ব নেয়া মিত্রাশক্তি ভারত। এম মোশারফ হোসেন চৌধুরী (এম,এন,এ) ও কমরউদ্দীন আহম্মেদ (এম,পি,এ) ভারতের সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা দাসপাড়া ভুইষপিটা, রাজগঞ্জ, বেরম্নবাড়ি ও অন্যান্য ছোট বড় বিভিন্ন শরনার্থী শিবির সমূহ পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভুমিকা রাখেন।

গেরিলা যুদ্ধ শুরু: মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড় একটি গুরুত্বপূর্ণ রনাঙ্গন ছিল। এই জেলা ভারতীয় সীমান্ত বেষ্ঠিত হওয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণসহ মুক্তিযযদ্ধের রননীতির সফল বাস্তবায়ন ঘটে।

১৭ই এপ্রিল থেকে মূলত: পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া থানা সীমানা বরাবর বাঙ্গালী সেনা ই,পি,আর মুজাহিদ, আনসার এফ এফ প্রম্নপ মূল ডিসেন্স স্থায়ীভাবে গড়ে তোলে। অপর দিকে অমরখানা বোর্ড অফিস পর্যন্ত পাকসেনাদের অবস্থান ও বিচরন ছিল। মে এবং জুন মাস থেকে এফ এফ (ফ্রিডম ফাইটার) গ্রম্নপের গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। উত্তর পূর্ব অংশে চাউল হাটি (জলপাইগুড়ি জেলা সংলগ্ন) এফ এফ ইউনিটের একটি ব্যাচ ছিল এবং সেখানে থেকেই ভারতীয় সেনা অফিসারদের পরিচালনায় এফ এফ গ্রুপ তাদের কার্যক্রম চালাতো। ভারতীয় সীমান্ত বরাবর ২কি:মিা: থেকে কতক ক্ষেত্রে ৫/৭ কি:মি: মুক্তাঞ্চল ছিলো। সে সমস্ত অঞ্চল গুলিতে এফ এফদের নিরাপদ বিচরণ ছিলো। এফ এফ গ্রুপ রাতের আাঁধারে এসে পাক সেনাদের অবস্থানোর উপর আঘাত করে পূনরায় ফিরে যেতো তাদের অবস্থানে। রাতের আাঁধারেই হেড কোয়াটার থেকেই বাংলাদেশের ভিতরে বিভিন্ন হাইড আউটে অবস্থান নিয়ে তাদের সুবিধামত এবং কৌশল গত ভাবে পাক সেনাদের উপর আঘাত হানতো। এমবুশে (ফাঁদে) ফেলে এফ এফ গ্রুপগুলো শত্রম্নপক্ষের পেট্রোল ও রেকি পার্টির উপর গেরীলা হামলা চালিযে চোখের পলকে স্থান ত্যাগ করত। প্রথম দিকে এফ এফ এর কাজ ছিল হিচ রান অর্থাৎ পাক সেনাদের উপর অতর্কিতভাবে আঘাত করা এবং তাৎক্ষনিক নিজেকে বাঁচিয়ে সরে পড়া। পশ্চিমাংশে আটোয়ারী থানা সংলগ্ন সীমান্ত পাড়ে থুকরাবাড়ি ও কোট গছ থেকে এফ এফ ইউনিট ব্যাচ পরিচালিত হতো এবং অনুরুপভাবে এফ এফ গ্রুপ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। কিছু কিছু এফ এপ গ্রুপ বলতে একটি টীম বুঝানো হয়েছে। সুবিধাজনক স্থানে থেকে অস্থায়ী ডিফেন্স গড়ে তোলে এবং সেখানে থেকেই পাক সেনাদের নির্ধারিত অবস্থান ও ঘাটি গুলোতে আক্রমণ করত। পাকসেনারা কৌশল অবলম্বন করে রাজাকার বাহিনীকে চলার পথে অগ্রগামী বাহিনী হিসাবে রাখতো প্রাথমিক অবস্থায় নিজেদের বাচানোর জন। ভারতের ভিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হাজার হাজার তরুণ ছাত্র সর্বস্তরের যুবক কিশোর প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে চলে যেতো। তেঁতুলিয়া থানা বরাবর মুক্তাঞ্চল ছিল। এই তেঁতুলিয়া এবং তেঁতুলিয়া রিক্রুটিং কেন্দ্রে ছিল। থুকরাবাড়ি, পানিঘাটা এবং মুজিব ক্যাম্পে (ভারত) এ অঞ্চলের সর্বস্তরের যুবকরা প্রশিক্ষণ নেয়। মক্তিবাহিনী তাদের অবস্থান থেকে রাতের আধারে অগ্রসর হয়ে ইনফরমেশন অনুযায়ী এবং নির্দেশ মত টার্গেট আঘাত হানে আবার ফিরে যেতো। এভাবেই সামনা সামনি যুদ্ধ। অনেক সময় খান সেনাদের সম্মুখে আকস্মিক ভাবে পড়ে যেতো মুক্তিবাহিনীর দল অথবা খান সেনাদের এ দেশীয় দোসর ও এলাকার পিসকমিটির ও রাজাকার দের ষড়যন্ত্রের কারণে এবং ইনফরমেশনে খান সেনাদের ফাদে পড়ে যেতো অনেক এফ এফ গ্রুপ এভাবেই সম্মুখ যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে তরুণ তাজা অনেক সূর্য সন্তানদের।

পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন থানা পরিষদ চত্বর সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রম্নটে পাকসেনাদের অবস্থান ছিল এবং ডাকবাংলো ও শক্ত ও মজবুত পাকা বাংলোগুলিতে সেনা অফিসাররা অবস্থান করতো, বিশেষ বিশেষ জায়গা এবং অবস্থানে পাকা কংক্রিটের বাংকার তৈরী করে সার্বক্ষনিক পাহারায় তাকত। সাজেয়া গাড়ী আর্টিলারী রেক নিয়ে খান সেনারা (২৫ পাউন্ডের গোলা নিক্ষেপন ) সর্বত্র মুভমেন্ট করতো, দেবীগঞ্জ,চিলাহাটি এবং ভাউলাগঞ্জে খান সেনারা এবং রাজকার বাহিনীর মূল অবস্থান ছিলো। বোদা থানা পরিষদ চন্দনবাড়ী বলরাম হাট, মাড়েয়া, সাকোয়া হাটে খান সেনাদের অবস্থান, তাদের অদূরে ১কি:মি: এর মধ্যে থাকতে রাজাকারের দল। আটোয়ারী থানা পরিাষদ চত্বর,মির্জাপুরের পুরাতন দীঘি এবং ডাঙ্গিতে। এ সমস্ত কার্যক্রম চালাতো। পাক সেনারা পঞ্চগড় সদর থানার ডাকবাংলো (বর্তামান) জেলা পরিষদ) ৪টি থানার হেড কোয়ার্টার হিসাবে ব্যবহার করতো এবং এখান থেকেই ৪টি থানায় সার্বক্ষনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো, ভৌগলিক ও কৌশলগতভাবে পুরাতন পঞ্চগড় ছিল তাদের মূল (উত্তর দিক থেকে করতোয়া নদীর ও পারে) অবস্থান। পঞ্চগড় সি,এন্ড, বি অফিস থেকে সুগার লিল পর্যন্ত এই অংশে যুদ্ধের বড় এবং ভারী অস্ত্র সমূহ থাকতো। তালমা ব্রীজ (হাফিজাবাদ) টাংগালী ব্রীজ, অমরখানা বোর্ড অফিস, জগদল হাট, পানিমাছ সহ গলেহা হাট, টুনিরহাট পাক সেনাদের অবস্থান ছিল। পঞ্চগড় জেলা ছাত্রলীগের শিক্ষিত তরুণরা বিএলএফ বাহিনীতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেয়,এবং পঞ্চগড় জেলা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেয়। পঞ্চগড় রাজনৈতিক জেলা বিএলএফ এর সংগঠক ছিলেন জনাব নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ। বিএলএফ ২টি ক্ষুদ্র ইউনিট পঞ্চগড়ের পূর্বাংশে চাকলায় এবং পশ্চিমে আটোয়ারী বার আওলিয়ায় তাদের অবস্থান নিয়ে কার্যক্রম চালাত। পঞ্চগড়ের চাকলার দায়িত্বে ছিলেন শামসুজ্জহা রবি এবং সহযোদ্ধা হিসেবে ওয়ায়সুল কোরায়শী, নু্রুল ইসলাম নুরু, আববাস আলী, তোতা, কাদের আরও অনেকে এবং বারআওলিয়ার দায়িত্বে ছিলেন ময়দান দীঘির আকবর মাষ্টার সহযোদ্ধা সায়খুল মির্জাপুরের হেলাল পঞ্চগড়ের ইসমাইল আবারও অনেকে। পরবর্তীকালে এম এ প্রধান, মজিদ বাবুল, সারোয়ার, আশিরুল, হেলাল, শামসুল, রবিউল, আওয়াল আরও অনেকে অংশ গ্রহন করে। আটোয়ারী থানার প্রধান সংগঠক ছিলেন বদরুদ্দোজা। অন্যদিকে সেক্টর ৬ এর বিভিন্ন রনঙ্গনে এফ এফ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন লেখক নিজে (মির্জা দুলাল) অতপর লিয়াকত, বাবলু, জাকের, রাজু, শরিফ, জামাল, হারম্নন অর রশিদ, ইসমালি, বকুল, মিজানুর, তেতুলিয়ার আইয়ুব, আশির উদ্দিন, কাজী মাজবুব সহ আরও অনেকে। ওভারলল বি,এল,এফ এর দায়িত্বে ছিলে ভারতের জেনারেল ওবান। এবং বাংলাদেশের এ অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জনাব সিরাজুল আলম খান (দাদা) ও মুনি্রুল হক মনি (মর্শাল মনি) স্বাধীনতা যুদ্ধ সুষ্টভাবে পরিচালনারা জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। পঞ্চগড় জজেলা ৬নং সেক্টরের অধীন  ছিল, সেক্টর কমান্ডর হিসাবে মরহুম এম,কে বাসার (বিমান বাহিনী) দ্বয়িত্ব পালন করেছেন, তার পাশাপাশি মেজর নজরম্নল ক্যাপ্টেন শাহারিয়ার ও ল্যাফটেনেন্ট মাসুদুর রহমান (বর্তমানে মেজর জেনারেল অব:) এ অঞ্চলের সেনা অফিসার হিসাবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পূর্বাংশে এফ এফ গ্রুপ সমূহের দ্বয়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন ভারতের সেনা অফিসার দায়ালশিং এবং পশ্চিমাংশে এফ এফ গ্রুপসমুহের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিলেন ক্যাপ্টন সুবাস ও মেজর শেরকী এবং আরও অনেকে। পশ্চিমাংশে কোটগছ এবং দাশপাড়া সীমান্ত থেকে পঞ্চগড় শহরের উপর প্রতিনিয়ত মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য দুর পাল্লার গোলা নিক্ষেপ করা হতো। যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনী এবং মিত্র বাহিনীর সাথে একটি সমন্বয় ছিল।

সিভিল প্রশাসন: মুজিব নগর সরকারের (স্বাধীনবাংলা) তেঁতুলিয়া থানায় একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে এবং অস্থায়ী সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচীর বাসত্মাবায়ন হতো। সে সময় তেঁতুলিয়া থানায় অবস্থানরত বিবিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ স্বাধীন বাংলা সরকারের (মুজিব নগর সরকারের) কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। অস্থায়ী বাংলাদেশ রকারের মহামান্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম, অস্থায়ী প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহম্মেদ সহ সরকারের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তেঁতুলিয়ায় এসেছিলেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম অবলোকন করেন। জলপাইগুড়ি থেকে তেঁতুলিযা হয়ে বেরং ক্যাম্প পর্যন্ত একটি মেডিক্যাল ইউনিট সার্বক্ষনিক কর্মরত ছিল। ডা: আব্দুর রাজ্জাক, ডা: আজিজার রহমান, মেডিক্যালের ছাত্রী হাসিনা বানু, রোকেয়া বেগম সেলিম উদ্দিনসহ আরও অনেকে সার্বক্ষনিক কর্তব্যরত ছিলেন।

পাক বাহিনীর দোসরদের তৎপরতা: পাক বাহিনী স্থায়ীভাবে এলাকায় সামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য এবং তাদের দোসর হিসাবে এ অঞ্চলের মুসলিম লীগ ও জামায়তে ইসলামীর নেতা কর্মদের নিয়ে জেলায়ও প্রতিটি থানায় পিস কমিটি গঠন করে এবং তাদের প্রচেষ্টায় রাজাকার বাহিনী তৈরী করে বর্বর পাক বাহিনী এই সমস্ত পিস কমিটির নেতা কর্মী ও রাজাকারদের সহায়তায় এলাকায় গণহত্যা, নারী ধর্ষন, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট এবং মুক্তি বাহিনীকে সহায়তা করে এই রুপ সন্দেহ হলে পরিবারের সদস্যদের নিমর্ম ভাবে হত্যা করা হয়। আবু আরিফ, প্রক্তন এম,পির পুত্র কাউসার আলী মুক্তিযোদ্ধা কাদেরের পিতা ইদ্রিস আলী, মুক্তিযোদ্ধা আছিরুলের পিতা আছিরউদ্দীন ইনফরমার আব্দুস সোবাহান ও তার ভাই লখিয়া, মুক্তিযোদ্ধা বাবলুর চাচা ইনসাফ আলী, আবু মোহাম্মদ। তবে পঞ্চগড়ের ভুইয়া মাষ্টার ও তার ছেলে কবির এবং তহশিলদার আব্দুর রহমান ১৭ই এপ্রিলে এবং পরে গন শহীদ হন। এ রুপ নাম না জানা অনেকেই শহীদ হন। আটোয়ারী থানায় বিভিন্ন গ্রামের বিভিন্ন সময়ে পাক সেনা ও দোষর দের দ্বারা যারা গন হত্যার শিকারা হয়েছে তাদের মাধ্য উলেস্নখ যোগ্য খাদেমুল ইসলাম, খসো মুহাম্মদ, আহসান হাবিব, আলী আহসান, রালেহা বেগম, ছুটু পাইকার, জাহেরুল, ইউনুস আলী, খবিরউদ্দীন, ইদ্রিস আলী, কদম আলী, কমিরউদ্দীন মাষ্টার, খয়ের মোহাম্মদ, আশির উদ্দীন আরও অনেকে (২৭শে মে থেকে আক্টোবর পর্যন্ত)

বিভিন্ন পেশার ও সংগঠন এবং মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অবদান: কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, কিশোর এবং মেহনতী জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি, ব্যবসায়ী, সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের  সর্বাত্বক অংশগ্রহন ছিলো মুক্তিযুদ্ধে তাদের আত্মিক ভালোবাসা ও সহযোগিতা মুক্তিযুদ্ধকে অগ্রায়ন করেছে। বিশেষ করে ভিতরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্বগোপন করার জন্য বিপদ মাথায় নিয়ে আশ্রয় দিয়েছে তাদের খাইয়েছে দিনের পর দিন, এই রুপ কর্মকান্ডে সাধারন মানুষ এবং রানী সমাজের অবদান ছিল অপরিসীম, বিভিন্ন সংগঠন যেমন ন্যাশনাল আওয়ামীলী পার্টি, কমিউনিষ্ট পার্টি এবং অন্য সংগঠন সমূহ অমত্মরদ্বন্দের এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পেক্ষাপট বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং নজরদারি করতে না পারার কারণে খোলামেলা বা ঢালাও ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে না পারলেও সংগঠন সমূহের নেতাকর্মী অঙ্গ সংগঠন এবং ছাত্র সংগঠন সমূহের নেতাকর্মীগণ এবং রাশিয়া লবিং এর রাজনৈতিক দল সমূহ বিচ্ছিন্নভাবে ভারত সরকারের সাথে যোগাযোর রক্ষা করে, এবং মুক্তিবাহিনীতে অংশগ্রহন করে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ এবং এর আদর্শ ধারাবাহিকতার বৈশিষ্ট্যই আলাদা। একটি দেশের সাথে অন্য একটি দেশের যুদ্ধ শুধু পাই কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সম্পূর্ন ভিন্নধর্মী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র মেহনতী জনতার সবার্ত্বক অংশগ্রহনের মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আদর্শের সফল ঐতিহাসিক বহি:প্রকাশ।

সম্মুখ যুদ্ধ ও পঞ্চগড় বিজয়: ১৯৭১ এর নভেম্বর থেকে ২ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনী যৌথবাবে পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন রনাঙ্গনে এবং বিভিন্ন রুটে সরাসরি আক্রমন চালায় এবং শুরু হয়ে যায় সম্মুখযুদ্ধ। জেলার পশ্চিম ও উত্তর পশ্চিমাংশে কোটগাছ ও থুকরাবাড়ি থেকে এফ এফ গ্রুপ গুলি  এগুতে থাকে, এক সাথে অগ্রসর হয়ে আটোয়ারী থানা দখল করে পঞ্চগড়ের দিকে এগুত থাকে। পূর্বাংশের এফ এফ গ্রুপ গুলি একত্রে অগ্রসর হয়ে তালমাব্রীজ, কালিয়াগঞ্জ, মারেয়া, সাকোয়া হয়ে বোদা থানার  মুক্তিবাহিনীর অন্যগ্রুপ গুলির সাথে মিলিত হয়। মূল এম এফ গ্রুপটি তেঁতুলিয়া পঞ্চগড় সড়ক ও জনপথের মূল সড়ক বরাবর পঞ্চগড়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তাদের সাথে ভারতীয় মিত্রাহিনী যোগ দেয়। এবং ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ট্যাংক ইউনিট আর্টিলারি ইউনিট দাসপাড়া থেকে বাংলাদেশের মিরগড়ের পাশ দিয়ে সি,এন্ড বি ভবন হয়ে পঞ্চগড় ঢুকে পড়ে এবং সামরিক হেলিকাপ্টারের সহায়তায় খান সেনাদের পাকা বাংকার ও মজবুদ অবস্থানগুলি ধ্বংস করে দেয়। সম্মুখ যুদ্ধে বহু মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রাবাহিনীর অফিসার ও সেনাসদস্য হতাহত হয়। পাক সেনাদের লাশ বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। তবে কৌশলগত ভাবে পাক সেনারা সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পৌছানোর প্রচেষ্টা চালায়। ২৮ নভেম্বর পঞ্চগড় চিনিকলে বাংলাদেশর পতাকা উত্তোলনকালে বাংকারে অবস্থানরত পাকসেনাদের গুলিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশিদ শাহাদত বরণ করেন। ২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে দেবীগঞ্জ ব্যতিত পঞ্চগড় জেলা সম্পুর্ন ভাবে শত্রুমুক্ত হয়। এবং পঞ্চগড়ের বিজয় হয়। এখানে  উলেস্নখ থাকে যে পঞ্চগড় রানাঙ্গনে যুদ্ধকালীন কমান্ডার পিন্টু, রৌশন, ওহিদার, কুড়িগ্রামের টুকু,  তিসত্মার দুলাল, ঠাকুরগাঁও আনোয়ার, খয়রম্নল বোদার জিবধন, শামসুল, সুলতান ও তারিকুল এবং আটোয়ারির এমতাজুল পঞ্চগড়ে রাজু, বাবুল, শফিউলসহ আরও অনেকে।

যুদ্ধহত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান: স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা যুদ্ধাহত এবং স্বাধীনতার সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনতে যারা শহীদ হয়েছেন সেই সব শহীদান ও পরিবারের অবদানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরউজ্জল হয়ে রবে। কেউ সমত্মান হারিয়েছেন, কেউবা হারিয়েছেন পিতা, ভাই, বোন আবার কেউ বা হায়েছেন পঙ্গু। অনেক ভাই বোন মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতার কারণে হয়েছের গণহত্যার শিকার গণ-শহীদ। তাদের অবদানের কথা ইতিহাসের পাতায় পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও করতোয়া রবে বহমান ততোদিন থাকবে তাদের নাম। এ অঞ্চলের সম্মুখ যুদ্ধে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন এবং ২০০ জন যুদ্ধাহত হয়েছে। গণ-শহীদ হয়েছেন হাজার ও মানুষ। এ জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা প্রায় ২০০০ জন।

স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গণ-কবর: দেবগঞ্জ থানার তিসত্মা হাটের পার্শ্বে মুক্তিযোদ্ধা দারোগায় কবর এবং শেখ বাধা মোড়ে ৩জন মুক্তিযোদ্ধার (স্কুল সংলগ্ন) পাকা কবর আছে। বড় শশী বিওপির পার্শ্বে ২জন ও বকদুলঝুলা বাজারের পার্শ্বে ১ জনের কবর আছে। এছাড়াও বোদা থানার নয়াদীঘিতে গণকবর রয়েছে এবং অজানা অনেক গণকবর আছে যার সন্ধান আজও মেলেনি। তেঁতুলিয়া থানার বামন পাড়ায় তেঁতুলিয়া সড়কের পার্শ্বে ৩জন মুক্তিযোদ্ধার পাকা কবর এবং ওমর খানায় অবস্থিত চাওয়াই নদীর পাড়ে ২ জন মুক্তিযোদ্ধার পাকা কবর আছে। ভজনপুর বাজারের উপরে মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ারের পাকা কবর রয়েছে। মতিয়ারের সাথে জহিরুল আহত হয়েছিল। এবং জগদল হাটের পশ্চিমদিকে সকিমউদ্দীনের পাকা কবর রয়েছে্ ভাতরীয় সীমান্ত গোড়ালবাড়ীতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার গাউসের পাকাকবর আজেও অযত্বে বিদ্যামান আটোয়ারী থানার ভারতীয় সীমান্ত কোটগছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশীদের পাকাকবরও অযত্নে আছে। আটোয়ারী থানার মির্জাপুরের পুরাতন দিঘীর পারে ১১ জনের গন কবর আছে। একটি ছোট স্মৃতি ফলকে তাদের নাম লেখা রয়েছে। পঞ্চগড় শহরের উপর প্রকৌশলী ফারুকের স্মৃতিসৌধ পঞ্চগড় শহরে ঢুকতেই চোখে পড়বে।

উপসংহার:- মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব থেকেই পঞ্চগড় একটি রাজনৈতিক জেলা হিসাবে পরিচিত ছিলো। একজন এম,এন, এ ও ২জন এম,পি এ ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষক, শোষিত, বঞ্চিতদের জিঘাংসার বহি: প্রকাশ। এ যুদ্ধ ছিল গণযুদ্ধ, সকল শ্রেণীর পেশার মানুষের সার্বিক অংশগ্রহনের মধ্যদিয়ে ঘটেছে স্বাধীনতার উম্মেষ।

 

 

২. মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা-২ঃ

freedom fighter

শরীফ উদ্দিন আহাম্মদ (মুক্তিযোদ্ধা)

আমি – সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের ভাষণের প্রেক্ষিতে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন ইন্টারমিডিয়েট(পরীক্ষার্থী) ছাত্র হিসেবে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ থানায় পাড়ি দেই। সেখানে এম.এন.এ. জনাব মোশারফ হোসেন চৌধুরী সাহেব থাকা এক বাসায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে রাজগঞ্জ ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগদান করার জন্য আদেশ দেন। আমি ৭ এপ্রিল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজগঞ্জ ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগদান করি। সেখানে ৫ দিন অবস্থান করার পর ভারতের মুজিব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্য যাই। মুজিব ক্যাম্পে ১ মাস ৬ দিন রাইফেল, এস.এল.আর., স্টেনগান, থ্রি-ইঞ্চ মর্টার, এল.এম.জি. এবং ৩৬ হ্যান্ড গ্রেনেড সহ এক্সপ্লোসিভ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে১০৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কোম্পানীর সঙ্গেমুজিব ক্যাম্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকেমুক্তিযোদ্ধা হেড কোয়ার্টার ভারতের কুচবিহার জেলার শীতলকুচি(বর্ডার এলাকা) হেড কোয়ার্টারে অস্ত্র গোলাবারুদ সহ যোগদান করি। আমার এফ.এফ. নম্বর টি/১১৪।সেখান থেকে প্রতি দিন বর্ডার পার হয়ে জয় বাংলার রংপুর হাতিবান্ধা থানার শিঙ্গিমারী অঞ্চলে দিনের বেলায় এম্বুশ (দুশমনকে ঘায়েল করার জন্য লুকিয়ে থাকা) হিসেবে ৫ ঘণ্টা অবস্থান করি। এভাবেহেডকোয়ার্টারে ১৫-২০ দিন থাকি। পরবর্তীতে শীতলকুচি মুক্তিযোদ্ধা  হেডকোয়ার্টার থেকে ভারতের দেওয়ানগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা হেডকোয়ার্টারে ১০৪ জন  বিশিষ্ট একটি কোম্পানী গোলা বারুদ সহ স্থানান্তর(ট্রান্সফার) করেন। আমরা সেখানে যোগদান করি। সেখান থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের ১০৪ জন বিশিষ্ট একটি কোম্পানীকে জুন ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ জয় বাংলা রংপুর ডিমলা থানার ঠাকুরগঞ্জ অঞ্চলে প্রেরণ করেন। সেখানে আমরা ৩৩ জনে ১ প্ল্যাটুন করে তিনটি ভাগ হয়ে হাইড আউটে অবস্থান করি। সেই হাইড আউট থেকে দুশমন অর্থাৎ পাকিস্তানি খান সেনা ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের ঘাটি দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হাইড আউট থেকে প্রতি রাত্রে এই কোম্পানীর তিন প্ল্যাটুন সমন্বয়ে দুশমনদের উপর গোলা বারুদ নিক্ষেপ করা হয় এবং প্রতিদিন সকাল বেলা ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এম্বুশ করে অবস্থান করতে হয়। তাতে প্রচন্ড শীত, প্রখর রোদে এবং পানিতে ভিজে খোলা আকাশের নিচে রাতদিন অতিবাহিত করতে হয়েছিলো। এভাবেই জুলাই’৭১ থেকে এফ.এফ.(গেরিলা) হিসেবে দুশমনদের(পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী) সঙ্গে লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রাখি।

নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে আমরা এক কোম্পানী বিশিষ্ট ৯৯ জন রাতে হানাদার বাহিনীর ঘাটিতে আক্রমণ করি। রাতে হানাদার/শত্রুদের উপর আক্রমণ করতে গেলে আমাদের লুকোনো পাসওয়ার্ড ব্যবহার হতো(যেমন পাসওয়ার্ড আকাশ/পাতাল/গোলাপ/পলাশ ও শিমুল ইত্যাদি ব্যবহৃত হত)। এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনী আমাদের আক্রমণের ফলে তাদের ঘাটি ছেড়ে পিছনে পলায়ন করতে বাধ্য হয় এবং সেই ঘাটি থেকে কিছু চাইনিজ অস্ত্র, গোলা বারুদ ও ১৯টি এন্টি-ট্যাঙ্ক মাইন উদ্ধার করে আমাদের হাইড আউটে নিয়ে আসি এবং হানাদার বাহিনীর ঘাটি আমাদের দখলে থাকে। এতে আমাদের সকল সাথী ভাই অক্ষত অবস্থায় থাকে। এভাবে তিন দিন পর আমি আমার ৩৩জন সাথী ভাইকে নিয়ে সকাল ৬টায় আমাদের হাইড আউট থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে এম্বুশ করে থাকি। ঠিক সাড়ে দশটার সময় এম্বুশের অবস্থান থেকে আমাদের পিছনে আমাদের হাইড আউটের বিকট শব্দ শুনতে পাই। এম্বুশ উইথড্র করে এসে দেখি কোম্পানী কমান্ডার সাহেবের হাইড আউটে উদ্ধারকৃত রাখা এন্টি-ট্যাঙ্ক মাইন একে একে ১৯টি মাইন বিস্ফোরিত হয়। সেই বিস্ফোরণে কোম্পানী হেড কোয়ার্টারে ৫জন সাথী ভাই শহীদ হন এবং একজন যুদ্ধে আহত হন। মাইনের আঘাতে তাদের শরীর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তা দেখে মনে সাংঘাতিক বেদনা অনুভব করি। পরবর্তীতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহের অংশবিশেষ একটি কফিনে করে জানাযার শেষে কিছু সংখ্যক সাথী ভাই মিলে দাফন করি। সেই বিস্ফোরণে শহীদ হন কোম্পানী টু আই সি স্বপন কুমার বকশী, সাথী সদস্য মোসলেম হক, আফজাল হোসেন, আব্দুল মান্নান ও আরো অজ্ঞাত একজন এবং আহত হয়যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা  সদস্য মোঃ ঝালু মিয়া, সাতমেড়া, পঞ্চগড়। সেই সাথী হারা বেদনা আজও মনের মধ্যে দাগ কাটে এবং গভীরভাবে অনুভব করি।

নভেম্বর’১৯৭১ এর শেষ দিকে এক দিন রাতে আমাদের কোম্পানীর ৬৬জন মিলে রাত্রিতে আমাদের গাইডার এর সহযোগিতায় দুশমনদের(হানাদার বাহিনী) ওপর আক্রমণ করতে যাই। এক পর্যায়ে সকাল ৬টায় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সামনা সামনি প্রচন্ড লড়াই শুরু হয়। লড়াইএর এক সময় আমাদের সাথী ভাই আজাহারগুলি বিদ্ধ হয়। সে গুলি বিদ্ধ অবস্থায় অস্ত্র ফেলে শীতের সকালে পুরো ধান ক্ষেতের মধ্যে “বাঁচাও বাঁচাও” বলে চিৎকার করে এবং পুরো ধান ক্ষেত রক্তাক্ত হয়ে যায়। বাঁচার তাগিদে চিৎকার করতে করতে সে ধানক্ষেতের কিছু কিছু জায়গায় ধানের আটি(থোপ) তুলে ফেলে এবং শরীরে রক্তক্ষরণ শেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শহীদ হয়। তার লাশ এবং অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সারাদিন দুশমনদের সঙ্গে লড়াই অব্যাহত ছিল এবং সন্ধ্যায় খান সেনারা সরে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে আমরা আজাহারের মৃতদেহ এবং অস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে আসি এবং জানাযার শেষে তার মৃতদেহ দাফন করি। শহীদ আজাহারের চিৎকারের আওয়াজ এখনো আমার কানে বাজে এবং অনুভব করলে আমি উদ্বেলিত হয়ে যাই। সাথী হারা বেদনা বড়ই মর্মান্তিক এবং কষ্টদায়ক ছিলো।

৬ই ডিসেম্বর’১৯৭১ ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং ভারতের মিত্র বাহিনী সহ দিনে রাতে হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ চলতে থাকে। দিন দিন আমরাসামনের দিকে অগ্রসর হই এবং অঞ্চল অঞ্চল দখল করতে থাকি। শেষ পর্যায়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ পুরো জয় বাংলা আমাদের স্বাধীন হয়। এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রংপুর জেলার নীলফামারির লটখানায় সমবেত হই এবং এক পর্যায়ে আমাদের অস্ত্র, গোলা বারুদ ক্যাপ্টেন ইকবাল, মেজর নজরুল ইসলাম এর নিকট সমর্পণ/হস্তান্তর করে রিলিজ অর্ডার নিয়ে সুদূর নীলফামারি থেকে হেটে হেটে নিজ বাড়িতে এসে বাবা মার পদধূলি নেই তাতে বাবা মা আমাকে পেয়ে হতবাগ চিত্তে দেখে এবং বলে ,”তুমি বেঁচে আছো?” অতঃপর আমি বাড়িতে অবস্থান করি।

এক্ষণে পরিসমাপ্তিতে আমি বলতে চাই যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ৪৭ বছর পর জাতির কিছু সংখ্যক গোষ্ঠী তিরস্কার স্বরূপ বলে ‘এরা কিসের মুক্তিযোদ্ধা, কেমন মুক্তিযোদ্ধা, এরা ভন্ড হিসেবে ছিল’। কিন্তু সেদিন ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়টি ছিল অতি কষ্টের এবং জীবন মরণের বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলি, সে দিনগুলি অতিবাহিত করেছি দিনের প্রখর রোদে, খোলা আকাশের নিচে, বাঁশঝাড়ে, গাছ তলায়, খালে খন্দকে, বর্ষার পানিতে ভিজে, এক গলা পানিতে অস্ত্র নিয়ে খালবিল পার হয়ে, অগ্রহায়ণ পৌষের প্রচন্ড শীতে, একদিকে সামনে হানাদার/শত্রুর ভয়, অপরদিকে  জনশূন্য মাঠের ঘাসে এবং পানিতে জোঁক(টিনা ও জলুক) নামের এক প্রকার রক্তচোষা প্রজাতির ভয় এমন দিনরাত জীবনবাজি রেখে দুশমন/শত্রুর সাথে লড়াই সংগ্রামে লিপ্ত ছিলাম। মনে হয়েছিল এক মাস যেন এক বছরের সমান। ভুলেগিয়েছিলাম বাবা-মায়ের, ভাই-বোনের এবং দাদা-দাদীর সেই মমতা আর আদর। লক্ষ্য ছিল শত্রু এবং দুশমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ/লড়াই করব এবং কোন দিন জয় বাংলা স্বাধীন করবো।তাই তাদের  সেই তিরস্কার ম্লান হয়ে যাক এবং আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ উন্নত এবং সমৃদ্ধশালী হোক এই আমার প্রত্যাশা। আমার দেশমাতৃকার কাছে সেদিনও কিছু চাওয়া পাওয়া ছিলো না এবং আজও কিছু চাওয়া পাওয়া নেই। সমাপ্তি। জয় বাংলা – বাংলাদেশ চিরজীবি হোক।